সদস্য
মদিনাতুল উলূম নাছিমা আক্তার কওমী মহিলা মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা: মোছাঃ নাছিমা আক্তারের জীবনালেখ্য
এক আলোকিত জীবনের গল্প: যে স্বপ্ন দেখেন একজন মা
মোছাঃ নাছিমা আক্তার একজন উদারমনস্ক, ধর্মপ্রাণ, ও শিক্ষানুরাগী নারী যিনি নারীর দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে নিজেকে নিবেদিত করেছেন। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১২ মার্চ ১৯৭৩ সালে, ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা মরহুম রইছ উদ্দিন আকন্দ ছিলেন একজন শ্রদ্ধাভাজন সমাজসেবক এবং মাতা মরহুমা আমেনা খাতুন ছিলেন ধার্মিক, মমতাময়ী এক আদর্শ নারী।
প্রথম অধ্যায়: জন্ম ও বংশপরিচয়
মোছাঃ নাছিমা আক্তার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৩ সালের ১২ই মার্চ, ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলার ভাটী সাভার গ্রামে। তাঁর পিতা ছিলেন সম্মানিত রইছ উদ্দিন আকন্দ এবং মাতা ছিলেন গুণধারী আমেনা খাতুন। স্নেহময়ী মা-বাবার আদর-যত্নে তিনি বড় হয়ে উঠেন গ্রাম বাংলার সরল-স্নিগ্ধ পরিবেশে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: শিক্ষাজীবনের সোপান
নাছিমা আক্তারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় আবদুল্লাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মেধাবী ও পরিশ্রমী এই শিক্ষার্থী ১৯৮৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন বোয়ালমারি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ১৯৯১ সালে এস.এস.সি পাশ করেন। মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন নান্দাইলের সরকারি শহীদ স্মৃতি আদর্শ কলেজে। ১৯৯৪ সালে এইচ.এস.সি পাশ করার পর তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য ময়মনসিংহের খ্যাতনামা মমিনুন নেছা সরকারি কলেজে স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হন।
তৃতীয় অধ্যায়: সংসার জীবন ও পরিবার
শিক্ষা, ধর্ম, ও নৈতিকতা – এই তিন মূল ভিত্তিকে সামনে রেখে মোছাঃ নাছিমা আক্তার শুধু নিজের জীবনই গড়েননি, বরং গড়েছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার এক শিক্ষাঙ্গন। তিনি যেমন নিজে ধর্ম ও শিক্ষায় এগিয়ে ছিলেন, তেমনি তাঁর সন্তানদেরও গড়ে তুলেছেন আদর্শ নাগরিক হিসেবে। নাছিমা আক্তার জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন মোঃ লুৎফুর রহমানকে, যিনি একজন সম্মানিত ব্যাংক কর্মকর্তা। তাঁর শ্বশুর মোঃ আরজ আলী এবং শ্বাশুড়ি মোছাঃ রাবেয়া খাতুনের আদর-স্নেহে গড়ে উঠেছে তাঁর সংসার জীবন। এই দম্পতির জীবনসঙ্গের ফসল হিসেবে আল্লাহ তাঁদের দান করেছেন এক ছেলে ও এক মেয়ে: পুত্র: মোকসিতুর রহমান শিহাব – একজন প্রগতিশীল প্রযুক্তি শিক্ষার্থী । অধ্যয়নরত: কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE), University of Development Alternative (UODA) মুহাম্মদ মোকসিতুর রহমান শিহাব একজন মেধাবী, পরিশ্রমী ও প্রযুক্তি-বান্ধব তরুণ, যিনি তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরে রেখেছেন কৃতিত্বের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ভাটি সাভার দক্ষিণ পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নান্দাইল, ময়মনসিংহ থেকে, যেখানে তিনি পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ থেকে জেএসসি ও এসএসসি উভয় পরীক্ষাতেই জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন সরকারি গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ-এ এবং এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.৮২ অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি অধ্যয়নরত আছেন বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় University of Development Alternative (UODA)-তে, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগে। শিহাবের চিন্তাধারা ও শিক্ষাগত লক্ষ্য UODA-এর মূলনীতি "মানব উন্নয়নের জন্য শিক্ষা"-র সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রযুক্তির জগতে অবদান রাখার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং দেশপ্রেম তাঁর চিন্তা-চেতনার মূল ভিত। ভবিষ্যতে একজন দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কন্যা: সানজিদা তাসনিয়া লুবনা – এক প্রতিশ্রুতিশীল আলোকবর্তিকা অধ্যয়নরত – গণিত বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) সানজিদা তাসনিয়া লুবনা একজন প্রতিভাবান ও মেধাবী শিক্ষার্থী, যিনি শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে প্রমাণ করে চলেছেন সাফল্যের চূড়ায়। তাঁর শিক্ষার শুরু সরকারি আদর্শ শিশু বিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ থেকে, যেখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন জিপিএ-৫ পেয়ে।
এরপর জেএসসি পরীক্ষায়ও তিনি এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পান জিপিএ-৫, এসএসসি-তেও একই বিদ্যালয় থেকে পুনরায় জিপিএ-৫ অর্জন করে কৃতিত্বের পরিচয় দেন। এইচএসসি-তে তিনি ভর্তি হন সরকারি গুরুদয়াল কলেজ, কিশোরগঞ্জ-এ এবং এখানেও নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি অধ্যয়নরত মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এ, গণিত বিভাগের অনার্স কোর্সে। শুধু ফলাফল নয়, গবেষণামূলক চিন্তা, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং গণিতের গভীরে প্রবেশ করার অদম্য আগ্রহ তাঁকে করেছে ব্যতিক্রমধর্মী।
লুবনার মধ্যে রয়েছে দেশের জন্য কিছু করে দেখানোর এক অন্তর্নিহিত তাড়না। একজন আলোকিত নারী হিসেবে তিনি যেমন একাডেমিক উৎকর্ষে উজ্জ্বল, তেমনি নৈতিকতা, ভদ্রতা ও সমাজ সচেতনতায়ও অনন্য। ভবিষ্যতে তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক এবং দেশের উন্নয়নে নিবেদিত একজন গণিতবিদ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
চতুর্থ অধ্যায়: বর্তমান জীবন ও সমাজসেবা
নাছিমা আক্তার পেশাগতভাবে একজন গৃহিণী, কিন্তু তাঁর চিন্তা-চেতনা ও কর্মপরিধি গৃহের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জ সদর থানার জনতা স্কুল রোডে বসবাস করছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা নান্দাইলের ভাটী সাভার গ্রামে। তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্বীনি শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। একজন শিক্ষিত মুসলিম নারী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মায়ের হাতে গড়ে ওঠে পরবর্তী প্রজন্ম। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি নারীদের কুরআন-হাদীসের আলোকে গড়ে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “মদিনাতুল উলূম নাছিমা আক্তার কওমী মহিলা মাদরাসা”।স্বামী মোঃ লুৎফুর রহমানের সহযোগিতায় তিনি এ প্রতিষ্ঠানকে নারীদের জন্য দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষার একটি আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করতে সচেষ্ট। তাঁর ব্যক্তিজীবন বিনয়ী, পরহেজগার, ও সমাজকল্যাণে ব্রতী। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জাতিকে সত্যিকার উন্নতির পথে নিতে হলে নারীদের দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করা অপরিহার্য।
পঞ্চম অধ্যায়: একটি স্বপ্নের বীজরোপণ
জীবনের এক লালিত স্বপ্ন এবং মাতৃত্বের গভীর উপলব্ধি থেকে নাছিমা আক্তার অনুভব করেছিলেন যে আমাদের কন্যাশিশুদের জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার। যেখানে তারা পাবে:
• দ্বীনি শিক্ষার মজবুত ভিত্তি
• আধুনিক শিক্ষার আলোকবর্তিকা
• নৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তা
• জীবনমুখী দক্ষতার প্রশিক্ষণ
এই চিন্তা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন "মদিনাতুল উলূম নাছিমা আক্তার কওমী মহিলা মাদরাসা"।
ষষ্ঠ অধ্যায়: একটি দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার
নাছিমা আক্তারের স্বপ্ন শুধু একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা হলো:
• নারী শিক্ষার বিকাশ: মহিলা শিক্ষিকাদের মাধ্যমে নারী শিক্ষার প্রসার
• সমাজ গঠন: শিক্ষিত মায়ের মাধ্যমে শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা
• সামাজিক দায়বদ্ধতা: গরীব ও এতিম মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা
• সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ: ইসলামী সংস্কৃতি ও বাংলা ঐতিহ্যের সমন্বয়
সপ্তম অধ্যায়: ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলী
নাছিমা আক্তারের ব্যক্তিত্বে মিশে আছে:
• দূরদর্শিতা: ভবিষ্যতের চাহিদা অনুধাবন করার ক্ষমতা
• দক্ষতা: গৃহিণী ও প্রতিষ্ঠাতা—দুই ভূমিকায়ই সফল
• সহমর্মিতা: সমাজের প্রতি গভীর মমত্ববোধ
• আধ্যাত্মিকতা: ধর্মীয় মূল্যবোধে অনড় বিশ্বাস
অষ্টম অধ্যায়: একটি জীবনের দর্শন
নাছিমা আক্তারের জীবন দর্শন খুবই সহজ কিন্তু গভীর:
"একজন নারীই পারেন পরিবার, সমাজ ও জাতির মৌলিক পরিবর্তন আনতে। আর এই পরিবর্তনের হাতিয়ার ইসলামি শিক্ষা—যেখানে দ্বীন ও দুনিয়া, আখিরাত, জ্ঞান ও কর্মের বস্তব সমন্বয় ঘটবে。"
উপসংহার: একটি অনন্ত প্রেরণা
মোছাঃ নাছিমা আক্তার শুধু একজন গৃহিণী নন, তিনি একজন দূরদর্শী সমাজসেবী, একজন আদর্শ মা এবং একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত "মদিনাতুল উলূম" শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি তাঁর জীবনের লালিত স্বপ্নের ফসল, একজন মায়ের তার সন্তান ও সমাজের প্রতি boundless love-এর expression。নাছিমা আক্তার সবসময় বিশ্বাস করেন—একজন মা জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাই তিনি নিজের সন্তানদের দ্বীন ও দুনিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষায় গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি, সমাজের অন্য মেয়েদেরও ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “মদিনাতুল উলূম নাছিমা আক্তার কওমী মহিলা মাদ্রাসা”।
এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নারীদের আত্মমর্যাদা, দ্বীনি জ্ঞান ও নৈতিকতাভিত্তিক সমাজ গঠনে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত করতে চান। তাঁর জীবনের এই মহান ত্যাগ ও উদ্যোগ সত্যিই সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।